বাস্তব জীবনের সবচেয়ে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ও দৃশ্য

1734
52143

দিনটা ছিল 24 এপ্রিল 2013 সাল lআর সেদিন এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে l সেদিন সকালে আমার ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিল lসেদিন যেহেতু আমার ব্যবহারিক পরীক্ষা ছিল তো আমি খুব ভালোভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে স্কুলের দিকে রওনা হলাম lআমি স্কুলে পৌঁছানোর 10 মিনিট পরে আমার ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু হলো l আমার ব্যবহারিক পরীক্ষা প্রায় শেষের দিকে,তখন আমার বন্ধু হঠাৎ আমাকে বলল , রানা প্লাজা ধসে পড়েছে lআমি চমকে উঠলাম lএবং আমার পরীক্ষা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে আমি বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলাম lবাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানোর পর দেখলাম অনেক  মানুষের সমাগম সেখানে তারপর অনেক কষ্ট করে আমি ওভার ব্রিজ পার হয়ে রানাপ্লাজার দিকে এগিয়ে গেলাম l পুলিশের হাতে তাড়া খেয়ে আমি ফিরে আসলাম lকারণ দুর্ঘটনাস্থলে এত পরিমাণ মানুষ ছিল যে সেখানে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি ছিল না l আর সেই কারণে সেখানে যাও আমার সম্ভব হয়ে উঠেনি l দূর থেকে মানুষের আর্তনাদ দেখে কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল lসেখানে এমন একটি পরিস্থিতি হয়েছিল তারা যার যার নিয়ে আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনকে খুজতেছে l এমন পরিবার আছে যার পরিবার চালনা করার একমাত্র ব্যক্তিটিও সে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চাপা পড়ে আছে lচারিদিকে যেন হাহাকার সাভার এর  বুকে যেন কষ্টের বন্যা নেমেছে ছিল l

সেই টাইমে পরিবেশটা  এত পরিমান মর্মান্তিক হয়েছিল  যে , সেখান থেকে কাউকে খুব দ্রুত ভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছিল না lসময় যত যাচ্ছে মানুষের আর্তনাদ ততই বেড়ে চলেছে  আসলে সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম স্বজনহারা বেদনা টা কেমন lসকলের চোখে পানি আর শুধু চিৎকার l যার সজন সে ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে তার চোখেও পানি  আবার যার কেউ নেই তার চোখেও পানি l এই মর্মান্তিক অবস্থায় সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল , “সেবক দলসহ বিভিন্ন সাধারণ মানুষ “ l সকাল গড়িয়ে দুপুর এল আর শুরু হল একেএকে মৃতদেহ উদ্ধারে যাত্রা আমি শুধু দূরে থেকে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখছিলাম lমৃতদেহ যখন ক্রমান্বয়ে বের করছিল  চারিদিকের মানুষ ছুটে যাচ্ছিল সেই মৃতদেহের কাছে l সকলেই সকলের প্রিয়জনকে খোঁজার তাগিদে ছুটে যাচ্ছিল সেই মৃতদেহের কাছে lরানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মৃত লাশ গুলোকে রাখা হয়েছিল lসাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় এর বারান্দায় ও মাঠে l

তারপর আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব  স্কুলে ফিরে আসি এবং আমার কিছু বন্ধু ও শিক্ষক মিলে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করি l সাভার অধর চন্দ্র স্কুলে জমা হয়েছিল সারা বাংলাদেশের হাজারো মানুষ lদূরদূরান্ত থেকে চালনা করার জন্য যে ব্যক্তি গুলো সাভারে এসেছিল তাদের লাশ নেওয়ার  জন্যই সব লোক এসেছিল সাভার অধর চন্দ্র স্কুলে lতাদের কাউরি খাওয়া-দাওয়া কিংবা ঘুমানোর কোন চিন্তা ছিল না শুধুমাত্র একটি চিন্তা ছিল প্রিয়জনের লাশ উদ্ধার l আর সেজন্য আমাদের দলটি গঠন করা হয়েছিল , দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষদের সামান্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য l এ পর্যায়ে আমরা কিছু বন্ধু এলাকার প্রত্যেক মানুষ বা যারা প্রভাবশালী ছিল তাদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা শুরু করলাম l কিছু টাকা সংগ্রহ করার পর আমরা কিছু বিস্কিট ও অন্যান্য জলখাবার গুলো কেনাকাটা করে রওনা হলাম সাভার অধর চন্দ্র স্কুলে l আমাদের ক্লাসের ছেলে মেয়ে উভয়েই আমরা সেখানে গিয়েছিলাম  l আমরা তাদের আর্তনাদ দেখে তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম এবং তাদেরকে জলখাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম l ইতিমধ্যেই সেখানে লাশ আসা শুরু করে দিয়েছে একেকটি  লাশের চেহারা খুবই কুৎসিত lলাশের এমন অবস্থা যে তাদের প্রিয়জনদের চেনার অবস্থা টুকু নেই l এভাবে জল খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করে প্রথম দিন কেটে গেল l

রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি  শুধু মানুষগুলোর আর্তনাদের কথা আমার চোখে ভাসছিল l সে কি মর্মান্তিক দৃশ্য lতারপরের দিন আমি খুব সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি lএবং কিছু প্রভাবশালী মানুষের কাছে গিয়ে আরো কিছু টাকা গুছিয়ে আমি আবার রওনা দেই সেই সাভার অধরচন্দ্র lআমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল মোটামুটি 12 থেকে 13 মিনিটের রাস্তা lগিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল lএকটি মানুষও রাতে ঘুমাইনি তাদের  যে অবস্থা দেখে গিয়েছিলাম তারা সেই একই অবস্থায় রয়েছে এখনো l তারপর আমি সেই মানুষগুলোকে একে একে খাবার দেওয়া শুরু করি l আমাদের খাবারের পরিমাণ ছিল খুবই অল্প প্রায় শেষের দিকে l তার কিছুক্ষণ পরেই বিভিন্ন কোম্পানি থেকে খাবার আসা শুরু করলো l সেগুলো আমরা কিছু বন্ধুরা মিলে নামিয়ে একেএকে সকলকে দেওয়া শুরু করলাম lসকাল দশটা নাগাদ মানুষের ভিড় আরো বেড়ে গেল আর মানুষের মৃত্যুর পরিমানও আস্তে আস্তে বাড়ছে l স্কুলে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসছে তো অপরটি যাচ্ছে আমার কাছে এমন টা মনে হচ্ছে যেন লাশ আনার পাল্লাপাল্লি চলছে l এভাবে চলে গেল আরও 2-3 দিন l অনেকেই তাদের স্বজনদের পেয়েছে l কিন্তু অধিকাংশ লোকই তাদের স্বজনদের কোন হদিস পায়নি এখনো l ইতিমধ্যে চারদিকে লাশের পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে তখন লাশ উদ্ধার করা আরো বেশি কষ্টসাধ্য ব্যাপার  হয়ে উঠেছে l তারপর আমি সে গন্ধযুক্ত লাশগুলোকে স্প্রে করা শুরু করলাম l তাদের সেই বীভৎস চেহারা দেখে আমার মনের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ কোন ভয় কাজ করছিল না l এমনো লাশ  দেখলাম পিলারের চাপাপড়ে সম্পূর্ণ শরীর চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছে lএমন একটি সময় আসলো যে লাশের পঁচা গন্ধে কেউ আর  স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছিল না  সবাই মুখে মাক্স ব্যবহার করতে শুরু করল l এভাবে চলতে থাকলো লাশ উদ্ধারের কাজ এবং আমাদের এই স্বেচ্ছাসেবক গুলোর কাজ গুলো l এরমধ্যে আবার লাশ কেনাবেচা শুরু হয়ে গিয়েছে l একথা বলার কারণ হচ্ছে লাশ শনাক্ত করার পর লাশ কে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার থেকে 20 হাজার করে টাকা দেয়া হচ্ছিল l আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আর ভাবলাম হায়রে আজব মানুষ l তারা  লাশগুলো নিয়ে দূরে কোথাও ফেলে দিচ্ছে শুধু মাত্র 20 হাজার টাকার জন্য  এই হলো আমাদের দেশের অবস্থা l  এভাবে আস্তে আস্তে এক সপ্তাহ কেটে গেল কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে চোখের পানি মুছে বাড়ি চলে গেল l আর কেউ বাঁচিয়ে থাকলো তার প্রিয় মানুষটির মৃতদেহের  অপেক্ষায় l

এটাই ছিল আমার জীবনের সবচাইতে দুঃখজনক এবং স্মরণীয় দুর্যোগ-দুর্ঘটনা l তাই এখনো আমি মহান আল্লাহতালার কাছে প্রার্থনা করি যে আমাদের কাউকে যেন এমন কোন পরিস্থিতিতে না ফেলে l

লেখক: মেহেদী হাসান

ঠিকানা: কুষ্টিয়া